করোনা আতঙ্কে গ্রামে ঢুকতে দেয়নি গ্রামবাসী, শ্মশানেই রাত কাটালো মা-ছেলে

0
41

করোনা আতঙ্কে গ্রামে ঢুকতে দেয়নি গ্রামবাসী, শ্মশানেই রাত কাটালো মা-ছেলে

রঘুদেবপুর: করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে। আর সেই আতঙ্কে গ্রামবাসী ঘরে ঢুকতে দেননি। তাই, বারো বছরের ছেলেকে নিয়ে শ্মশানেই রাত কাটালেন দিল্লি-ফেরত এক মহিলা। রাত জেগে মেয়ে ও নাতিকে পাহারা দিলেন মহিলার বৃদ্ধ বাবা।

তারপর, শনিবার সারাদিন থানা-পুলিশ করে মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে যখন ঘরে ঢুকলেন ওই বৃদ্ধ, তখন ঘড়ির কাঁটা তিনটে ছুঁইছুঁই। শুনতে গল্পের মতো মনে হলেও এটাই সত্যি। বাস্তবে এমনই ঘটনা ঘটেছে উলুবেড়িয়ার রাজাপুরে।

বিয়ের পরে রঘুদেবপুর পঞ্চায়েতের পাঁচলা ডাকবাংলো এলাকার মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর স্বামীর সঙ্গে থাকতেন দিল্লিতে। সেখানেই সোনারুপোর কাজ করতেন তাঁর স্বামী। বছর চারেক আগে স্বামীর মৃত্যুর পরে আর শ্বশুরবাড়ি বাউড়িয়ায় ফিরতে চাননি মহুয়াদেবী।

ছেলেকে নিয়ে থেকে গিয়েছিলেন দিল্লিতেই। জরির কাজ শিখে যখন তিনি স্বনির্ভর হয়ে ওঠার লড়াই লড়ছেন, তখনই করোনা-হানায় বেসামাল হয় দেশ। শুরু হয় লকডাউন। কাজ হারান মহুয়াদেবী। চার মাস কোনওরকমে কাটানোর পরে তিনি ঘরে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

শুক্রবার বেলা ১২টা নাগাদ পাঁচলা ডাকবাংলোয় নিজের গ্রামে ফেরেন মহুয়া। তখনও জানতেন না, বদলে গিয়েছে তাঁর গ্রাম। মহুয়ার কথায়, ‘‘দু’বছর পরে বাড়ি ফেরার আনন্দে মনটা বেশ ফুরফুরে ছিল। কিন্তু এমন যে ঘটবে, তা কল্পনাতেও ছিল না।’’

তাঁর কথায়, ‘‘আমাকে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেন কয়েকজন গ্রামবাসী। বলেন, আমরা এখানে থাকলে করোনা ছড়াবে। আমি ও আমার বাবা ওঁদের অনেক অনুরোধ করি। কিন্তু ওঁরা কিছুতেই রাজি হয়নি।’’ মহুয়াদেবীর বাবা সুদর্শন পান্ডে বলেন, ‘‘আমি গ্রামবাসীকে কথা দিয়েছিলাম যে, ১৪দিন মেয়ে-নাতি বাড়িতেই থাকবে। তাতেও ওঁরা রাজি হননি।’’

সুদর্শনবাবুর আর একটি বাড়ি রয়েছে পাঁচলার সাহাপুরে। বেলা ৪টে নাগাদ মেয়ে-নাতিকে নিয়ে সেই বাড়িতে যান তিনি। অভিযোগ, সেখানেও হাজির হন স্থানীয় লোকজন। তাঁরা দাবি করতে থাকেন, অবিলম্বে মহুয়াদেবী ও তাঁর ছেলেকে বাড়ি ছাড়তে হবে। অগত্যা, চাপের মুখে সেই বাড়িও ছাড়তে হয় তাঁদের।

তারপর আর উপায় না পেয়ে রঘুদেবপুর আগুনখালি শ্মশানেই কাটিয়ে দেয় রাত বলে জানান তিনি। মেয়ে আর নাতিকে নিয়ে সারারাত শ্মশানে কাটাই। সারারাত ওদের পাহারা দিয়েছি।’’

এরপর স্বাস্থ্যপরীক্ষার পরে চিকিৎসকেরা তাঁদের ১৪দিন গৃহ-নিভৃতবাসে থাকার পরামর্শ দেন। সেই নথি নিয়ে ফিরে আসেন গ্রামে। কিন্তু ফের তাঁদের গ্রামবাসীর বাধার মুখে পড়তে হয়। হস্তক্ষেপ করেন স্থানীয় সিপিএম পঞ্চায়েত সদস্যা কেতকী রায়চৌধুরী। তাতেও কোনও ফল হয়নি। তিনি বলেন, ‘‘গ্রামের মানুষকে বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু আমার কথা শোনেনি।’’

এ দিন দুপুরে এলাকায় যায় পুলিশ। বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনার পরে তাঁরা মহুয়াদেবী ও তাঁর ছেলেকে ঘরে ঢুকতে দিতে রাজি হন। মহুয়াদেবীর আক্ষেপ, ‘‘যেখানে ছোট থেকে বড় হয়েছি, যাদের সঙ্গে খেলা করেছি, তারাই আমাকে গ্রামে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। এটা আমার কাছে লজ্জার।’’

শেয়ার করে ভারতীয় হওয়ার গর্ব করুন

আপনার মতামত জানান